মানুষ সর্ব শ্রেষ্ঠ?
সত্যি কি তাই?
প্রশ্নগুলো শুনে মনে হয় রাশভারী কোনো হাবুগুবু আলোচনা শুরু করলাম বুঝি। আরে ধুর!! বাদ্দেন। আমি ওসব ভয়াবহ বোরিং আলোচনায় যাইনা। বরং কিছু হাস্যকর প্রশ্ন জন্মায়।
যেমন ধরুন- আমি কি আসলেই মানুষ? কিন্তু কেনো মানুষ? আমি নিজেকে মানুষ ভাবি বলেই আমি মানুষ। তাই না? বীজগনিতের মত মনেকরি, আজ থেকে আমি মানুষ না। আমি – আমি , আমি একটা কুনো ব্যাঙ।
ছোট বেলায় কুনো ব্যাঙ দেখেছিলাম, আমাদের মসজিদ মার্কেটের পেছনে দু কামরার ( মাঝের কামরায় হার্ডবোর্ড দিয়ে পার্টিশন দিয়ে দুটো করা হয়েছিলো) ঘরের কোনায়। আম্মু তখন আনেক ছোট্ট খুকি ছিলেন। আমার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতে আব্বু দুটি কাঠের ব্যট আর একটা প্লাষ্টিকের কর্ক এনে দিয়েছিলেন। আমি আর আম্মু খেলতাম।
ঐ কামরাগুলো তখন বেশ বড় মনে হতো, কিন্তু প্রায় ১০ বছর পর আঁশটে একটা মটকা গন্ধ আর প্যলেস্তার খসে পড়া ছাঁদ (আমরা ওখানে থাকতেও মাঝে মাঝে মশারীর উপর খসে পরতো) লবন ওঠা মেঝে দেখে আমি অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে। নিজের জন্য খুব মায়া হলো। সেই সময় এই ছোট্ট রুমগুলোতে কি করে ছিলাম!! তাও যে সে থাকা নয়, বেশ সুখে থাকা।
প্রথম সন্তানরা সৌভাগ্যবান এজন্য যে মায়েদের সব মমতা আর ধৈর্য এবং জমিয়ে রাখা পরিকল্পনার আদরে সে বড় হয়। আহ্লাদী মামনিটাই ছিলো আমার একমাত্র খেলার বন্ধু। তো একদিন খেলতে গিয়ে কর্ক উড়ে পড়লো কোনায়। আনতে যেয়ে দেখি নাদুসনুদুস একখান কুনো ব্যাঙ একদম মহাজনের মতো আরামসে বসে আছেন। আম্মুকে বললে আম্মু যতটা না আগ্রহে ওটার দিকে তাকালেন তার চেয়ে তাঁর চেহারায় ভয়ের প্রকাশ ছিলো অত্যাধিক। মনে হলো প্রাগৌতিহাসিক কোনো ডায়নোসর তার শিকারের দিকে তাকিয়ে আহুম উহুম করছে। আর আম্মি !!
যে করেই হোক ওটাকে বের করতেই হবে।
কিন্তু আজ আমি নিজেই ব্যাঙ। কে আমাকে বের করবে? আম্মু? জীবনেও না। ব্যাঙ হোক আর সাপ হোক ছেলে ছেলেই। তাকে কি আর বের করে দেয়া যায়?
নিজেকে ব্যাঙ ভাবলেও কপাল গুনে বেঁচে গেছি ব্যাঙ কাটার মতো নৃশংস একটি অধ্যায় থেকে। যারা সাইন্স গ্রুপ থেকে পাশ করেছেন (কিংবা ফেইল করেছেন) তারা অনেকেই ব্যাঙ কেটে মানুষ কাটার স্বাদ আহরণ করেছেন। আমি না কাটলেও বিজ্ঞান ভবনে গিয়ে জীবন্ত ব্যঙ্গের বিদির্ণ বক্ষ উন্মোচন করে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আর ফুসফুসের উঠানামা দেখার মতো আদিম পৈশাচিকতাকে কোনো মতেই অপূর্নাঙ্গ রাখতে সক্ষম হইনি। দেখেছি জীবন্ত ব্যাঙএর বুকে সেলাই করে তাকে ছেড়ে দেয়া এবং তার লাফিয়ে লাফিয়ে কিছুতেই বুঝে না উঠা এই মানব প্রকৃতির প্রতি এক বুক ব্যাথা নিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার শেষ চিহ্নটুকুও।
বানর তো মানব জাতির সবচেয়ে কাছাকাছি। কেন বানর কাটা হয়না? ব্যাঙকেই কেনো কাটা হয়? কারন আমার মতে দুটো।
এক- ব্যাঙ দেখতে ছোট হলেও শারীরিক গঠন অনেকটা মানুষের মতোই।
দুই-বানর অনেক চালাক কিন্তু ব্যাঙ অনেক বোকা এবং সহজলভ্য।
আর তাই
বেচারা ব্যাঙ
বাড়িয়ে ঠ্যাঙ
চিৎ পটেঙ।
কুংফু হাসেলে ভিলেনটা কিন্তু শেষের দিকে ব্যাঙ হয়ে যায়। আমার নিজেকে ব্যাঙ ভাবা আজকে থেকে শুরু। কাল সকালে গেইটম্যান সবুজ ভাই বের হওয়ার সময় যখন জিজ্ঞেস করবে স্যার কখন ফিরবেন?
আমার জবাব হবে- ক্রুকুক-ক্রুকুক। মানে তারাতারি। আমরা যতই বলিনা কেনো ব্যাঙ ঘ্যাঙ্গর ঘ্যাঙ্গর করে ডাকে কিন্তু সত্য নয় এটা। আমরা কবেই বা সত্য বলেছিলাম? সত্যতো কেবল ডিকসনারিতে জিইয়ে রাখা একটি জিয়ল শব্দ। আমি নিজ কানে ব্যাঙকে কোনো দিন ঘ্যাঙ্গর ডাকতে শুনিনি। কেউ শুনেছে এমন প্রমাণও মিলবেনা।
সবুজভাই হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকবে। এর পর চোখে হালকা একটা ডলা মেরে আবার জিজ্ঞাসু নেত্রেঃ স্যার আপনি ব্যাঙএর মত শব্দ করছেন কেনো?
সেই জগৎবিখ্যাত হাসিখানা টলমল করে বলবো-ক্রুকুর ক্রুকুর ক্রুকুর। প্রথমটা হচ্ছে নিজেকে, পরেরটা ব্যাঙ, এরপর ভাবছি। আমার পাগলামো দেখে উনার নির্ঘাত মাথায় গোলমাল দেখা দেবে। এবং সিঁড়ির নিচের ছোট্ট মুরগীর খোপের মতো রুমে খাটের মধ্যে বসে সমানে বালতি নিয়ে পানি ঢালবেন অন্তত ৩০ মিনিট।
আমি এদিকে ব্যাঙদের জনপ্রিয় কোনো গান ক্রুক ক্রুক করতে করতে বাইরে বেরিয়ে আসবো। আচ্ছা ব্যাঙদের প্রিয় গান কি? আমরা ওদেরকে বৃষ্টির দিনে কোরাস গাইতে শুনি। মানুষ ফুর্তিতে থাকলে যেমন জোরে গান গায় তেমনি ওরাও হয়তো। যেমন এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে ব্যাঙদের সবচেয়ে প্রিয় গান “আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম” ওদেরকে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা দেয়া হলে ওরাও হয়তো ক্ষুদে কোনো এম্পিথ্রী প্লেয়ার আবিষ্কার করতো যা হতো ওয়াটার প্রুফ। বৃষ্টির মধ্যে ওরা কানে লাগিয়ে শুনতো— আরে? মানুষের বুদ্ধিমত্তা? ওহো- ব্যাঙ হতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম আমার যে বুদ্ধিমত্তা আছে। তাহলে কাহিনি কি? আমার বুদ্ধিমত্তা আছে আর ব্যঙএর নেই? কিন্তু ব্যঙএর যেটা আছে- ওটা কি?
ওটা হচ্ছে ফিল। আজকাল অত্যাধিক মাত্রায় প্রচলিত একটি শব্দ হচ্ছে ফিল। ফিলিং করা- আমি কাউকে বা কোনো কিছুকে ফিল করছি। ভাবতেই কেমন যেনো শিহরিত হই। মনে হয় যেনো—কি মনে হয়? মনে হয় ফিল করছি- আহ!! বুক ভরে দম নেই। বহুজাতিক কোম্পানি তাদের মায়াময় বিজ্ঞাপন আর স্লোগানে আমাদের শেখায় জাষ্ট ফিল ইট। ওরা দেশের প্রতি আমাদের মায়াকে নিজেদের পন্যের জন্য ব্যাবহার করে দেশকে ফিল করতে শেখায়। দেশ নিয়ে কিংবা জীবন নিয়ে থিংক করতে শেখায় না। এজন্যই ওদের শ্লোগান হয় বন্ধু আড্ডা হাড়িয়ে যাও। কিন্তু হাড়িয়ে যাওয়ার পর ছেলে কিংবা মেয়েটির যে দ্বির্ঘস্থায়ী একটা শুন্যতা কিংবা তাদের বাবা মায়ের যে শুন্যতা সৃষ্টি হবে সেটার দ্বায়ভার কি ডিজুস নেবে? কোনদিন না।
ফিলের কাজ হচ্ছে র্যাম এর মতো। পিসির অস্থায়ী মেমরি র্যাম। ফিলিং আসলে কিছুটা সময়ের কিংবা মুহুর্তের ব্যাপার মাত্র। এর পর ভুলে যাওয়া কিংবা ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়া অথবা বহু বছর পরে কোনো এক বিকেলে বুকের মধ্যে এক দলা কষ্ট জমিয়ে নষ্টালজিক হয়ে উদাস আকাশ দেখা। অদ্ভুত কি?? ফিল অনেক প্রচন্ড। মানে এর শক্তি দুর্বার, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী।
রায়হান স্যার প্রজেকশনে বেশ কদিন আগের মহাখালীর একটি বিলবোর্ডের ছবি দেখাচ্ছেন। ওখানে একটি তরুনী জিন্স আর টপ পড়ে বাবল আপ এর এক লিটার বোতল হাতে দাড়িয়ে। পাশা পাশি ওরই আরেকটা ছবিতে পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে একটা হাফ লিটারের বোতল হিপের ওখানের পকেটে আর অন্য একটা মুখে। স্যার জানতে চাইলেন এর অসঙ্গতি গুলো কি? হাত তুললাম। খাঁটি ইংলিশে বললাম (তখনো ব্যাঙ হইনি)
১। ড্রেস কোড
২। উইমেন এপল
ওয়াই শি পুটস আ বটল অন হার হিপ?
স্যার আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন ট্যাবুর কারনে শব্দ উচ্চারণ করতে পারছোনা? ইউ আর এবস্যুলেক্টলি রাইট- দা বিগ পয়েন্ট ইজ সেকজুয়াল এপল। দে ট্রাই টু এট্রাক্ট দা ইয়থ।
তামিম- আমাদের খুবই প্রিয় ক্লাসমেট। একজন সফল ডিজে অর্গানাইজারও সে (আমি ওকে বন্ধু বলিনা। যদিও ও আমাকে কারও সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে তা’ই বলে। ও শুনলে হয়তো মনক্ষুন্ন হবে কিন্তু সত্য হচ্ছে আমি কাউকেই বন্ধু বলিনা। বন্ধুত্বটা আমার কাছে খুব একটা সহজ বিষয় না। এজন্যই হয়তো বন্ধু পাইনি খুব এটা। খারাপ হয়নি। নিজের মতো করেই থাকি) স্যারকে বললোঃ উই সুডন্ট লুক ইট ফ্রম রিলিজিয়াস ভিউ।
বলিঃ ইটস এভ্রিথিং ইম্মাই লাইফ। বাট মাই পয়েন্ট ইজন্ট রিলিজিয়ন। ইটস কান্ট্রি এন সোশ্যাল কোড। কোনো কম্পানি চাইলেই এটা ব্রেক করতে পারেনা। আই ডিডন সে এবাইউ হিজাব, মাই কমপ্লেইন অন ওয়েষ্ট্রানাইজেশন।
ফিল এর বিপরিতে যে বিষয় তা হচ্ছে থিংকিং। আমাদেরকে কখনোই কেউ থিঙ্ক করার ব্যাপারে উৎসাহিত করছেনা। কেবলি ফিল করো, ফিল করো—থিংক করলেই হয়তো আমরা ব্যাং থেকে মানুষ হয়ে উঠবো। মানুষ আসলে মানুষ এবং মানুষ না এ দুয়েরই সহাবস্থান। এক্ষেত্রে এই প্রজাতিটি আমার মতো ব্যাঙমানুষ।
স্যার এবার এগিয়ে আসলেন। শিক্ষকরা বোধহয় আমার মতোই ভাবে অথবা আমি শিক্ষকদের মত ভাবি। ক্লাসে স্যার বুঝাতে থাকেন কি করে ওয়েষ্টকে প্রাইম হিসেবে শো করে সুপিরিওর পজিশনে নিয়ে আসা হচ্ছে। ধিরে স্যারের কন্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে আসে আমার কানে। চারিদিকে তাকিয়ে সবার বিরক্ত ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে বড় একলা মনে হচ্ছিলো। ওরা সমস্যায় পরে অস্থির একটা জীবন যাপন করছে। কিন্তু কেউ যখন সমস্যার গোঁড়া গুলোকে চিহ্নিত কছে তখন তাকে বলছে নেরো মাইন্ডেড, অথবা পাত্তাই দিচ্ছেনা। কারন ওরা সেই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে নিজেরা সমস্যার কারনকে চিহ্নিত ও করতে পারছেনা।
নিজেকে একটা ব্যাঙ ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছিলো ঠিক তখনই।
কোন ব্যাঙ? যে ব্যাঙকে ল্যাবে ফেলে বহুজাতিক কোম্পানি বুক চিরে তার ভেতরে পশ্চিমা দর্শনে জীবনাচারের জেনেটিক কোড এপ্লাই করে দিচ্ছে। আর ব্যাঙ আহা!! উহু!! কাতুকুতু লাগে বলে হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছে এই ভয়াবহ পৈশাচিক অপারেশানকে। টেরই পাচ্ছেনা। আর ওরা? কোটি ডলার ঢালছে আমাদের মতো সামাজিক আচার আচরন আর পারিবারিক সিষ্টেমে কি করে ফেরৎ আনা যায় সেই গবেষনায়।
হায়!! কি গর্ধব প্রজাতির ব্যাঙ আমরা। ধিরে আমাদের চোখে সওয়া হয়ে যাচ্ছে সকল অশ্লীল বিষয়াবলী। এর বিপরিতে একদল মূর্খ আছে যারা এগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পার পেতে চায়। তাতে মুক্তি মিলবেনা গো ব্যাঙ। বরং বিশুদ্ধ ও শৈল্পিক মানে উন্নিত বিকল্প ব্যাবস্থাই এর সমাধান হতে পারে- যা বাঁচিয়ে রাখবে নিজের শেঁকড় ও বিশ্বাস।
যেদিকে তাকাই কেবল ব্যাঙ আর ব্যাঙ। নিজেকে যা ভাবে অপরকেও সেই অনুযায়ী পরিমাপ করাটা প্রাচীন একটা অভ্যাস মানুষের। তাই আমারও মনে হলো আশেপাশে সবাই ব্যাঙ। ভয়াল কোনো ঝড়ের আগে ব্যাঙগুলো যেভাবে ডাকে ঠিক সেভাবেই বুঝি পৃথিবী ব্যাপী রোল উঠেছে- ক্রুকুক ক্রুকুক ক্রুকুক।
কেবল একটা ব্যাঙ ই কিছুটা ব্যাতিক্রমি সুরে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইছে ক্রুকুক্রুক—ক্রুক্রুকুক ( যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে)