যা থেমে গেলেই শেষ ১৭ (বাবারা হারায় কেনো?)

13 11 2010

রাজ্যের সব ক্লান্তি এসে চেঁপে বসে বুকটাতে। পরীক্ষা শেষ। কিন্তু অনাবিল কোনো ছুটির আনন্দ তাড়ায় না। মনে হয় গুম মেরে বসে থাকি। পরিচিত কাছের মানুষদের সাথে কথা বলতে বলতে কোথায় হারিয়ে যাই বুঝতে পারিনা। মনে হয় অনেকটাই উদাস হয়ে পরলাম। ভিষণ রকমের বেখাপ্পা লাগছে সবকিছু। যাদেরকে অনেকেই বুদ্ধিমান বলে তারা থিওরী দেন মানুষ যাষ্ট একখান বায়োলজিক্যল প্রাণী। কয়েকদিন দেখছিলাম আশেপাশের কিংবা পথের হকার, ভিক্ষুক- এমনকি ভ্যানগাড়ীতে করে সবজী ফেরী করা লোকটি আর তার লাল চুলো হ্যাংলা পাতলা গড়নের শুকনো মুখো পিচ্চিটাকে। আবার বাসার পাশের কাবাব ফ্যাক্টরীর গাড়ীগুলোকে পাহাড়াদেয়ার সিকিউরিটি গার্ডকেও দেখলাম। যখন মনে হলো সব প্রাণীগুলো কি অদ্ভুত ভঙ্গীতে নড়াচড়া করছে। এইসব নড়াচড়াকে কখনো অভিবাদন, স্বাগতম আবার কখনো বিদায় সম্ভাষণ বলে থাকি। মানুষ নামক এই জীবটা এত্তো রকমের অঙ্গভঙ্গী করতে পারে। আসলেই অদ্ভুত।

জৈবীক আকর্ষণে কারো আশে পাশে ঘুর ঘুর করে। আবার আকর্ষন ছুটে গেলে যে যার মতো। মাথায় ধাম করে লাগিয়ে দিতে গেলেও তাকে চিন্তা করি অন্য পশুর মতোই। দিকনা। ক্ষতি কি? এর মানে কি? কিন্তু ভাপা পিঠা খেতে অর্ডার দিয়ে আমরা তিনজন যখন চেয়ারগুলোর পায় ভার বাড়িয়ে দিলাম ক্লান্ত মরুর চোখ নিয়ে টোকাই বুড়ি হাজির। কাঁধে একটা সাদা বস্তা। বুড়ি আপন দুঃখের কথা বর্ণনা করেই যাচ্ছেন। তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভেতরে প্রবেশের আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। ছেলে আছে- ছেলেরা খোঁজ নেয়না। মা কোথায় পড়ে আছে তাদের মস্তিষ্কের কোষে সেই বিষয়ে জানার কোনো আগ্রহ ই নেই। বরং বেশ খুশি- বুড়িটা আর জ্বালাতে আসছেনা। শুনছি- কেবল শুনছি। গভীর আগ্রহের সাথে তাকিয়ে আছি। মহিলা হয়তো এমন কাউকে বহুদিন পায়নি যাকে ঐ পোড়া ছোট্ট শুকনো বুকের কষ্টগুলো বলা যায়। কারই বা এমন অফুরন্ত অবসর আছে এসব শোনার? কানে ডায়মন্ডের মতো করে কাটা প্লাষ্টিকের পাথরটা ঝুলতে ঝুলতে ঝিলিক দিচ্ছে। বাচ্চা মেয়েগুলো কিংবা জোয়ান পথের নারীদের কানে এমন জিনিস থাকে সাধারনত। অজস্র শব্দমালা শেষ হলে লকলকে হাতের হাড়ের মজ্জা ক্ষয়ে যাওয়া আঙ্গুলগুলোতে বস্তাটাকে আলগা করে নেন মাটির কোল থেকে।

আলোচনা তুমুল চলছে। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে না। বিভিন্ন ইজম, এসবের সফলতা-ব্যার্থতা। বালক এসে হাত পেতে। উস্কো চুলে সাধারন আর সব পথশিশুদের মতই দেখতে। চেহারায় ধুলোর আস্তরন জমে মলিনতার শ্রেষ্ঠতর চুড়ায় গিয়ে ঠেকেছে। সাথের সম্মানিত প্রিয় দু’জন ওর জন্য পিঠে আনতে গেলো। আমি দূর থেকে একটি চেয়ার টেনে এনে ওকে বসতে দিলাম। কোথায় থাকে, সাড়াদিন কি করে, বাবা মা কি করেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়। সব কমন। যাকেই জিজ্ঞেস করেছি কেবল ঘুমানোর যায়গা কিংবা রাতের ছাউনিটাই শুধুমাত্র ভিন্ন। এছাড়া বাকি সব উত্তরই একরকম। যে উত্তরটা শুনলেই কলজেটাতে প্রচন্ড একতা ঝড় উঠে, যেটা শুনলে ক্ষোভের প্রচন্ডতায় রোমকূপের গোড়ায় গোড়ায় অন্যরকম কিছু অনুভুত হয় সেটা হচ্ছে-আব্বা হারায়া গেছে। ভেতরটা মনে হলো শ্রাবনের মতো অঝোড়ে কাঁদছে। খাচার প্রতিটি হাঁড়ে এর ছোয়া টের পাই। আব্বা হারিয়ে যাবে কেনো? তাহলে তার আব্বা হওয়ার কি প্রয়োজন ছিলো? কি প্রয়োজন ছিলো আরেকটা মানুষকে দুনিয়ায় এনে এভাবে বিভৎস একটি পৃথিবীতে অসহায় বেড়াল ছানার মতো ফেলে রেখে উধাও হয়ে যাওয়ার?

সাকিবকে যখন আব্বু মসজিদে নিয়ে যেতেন তখন ওর বয়স চার বছর ছেড়ে নতুন বছরে পা দিচ্ছিলো বোধহয়। আমি তখন আমার সমবয়সীদের সাথে দাড়িয়ে নামাজ পড়ায় অভ্যস্ত হয়ে পরেছিলাম। বাসা পছন্দের ক্ষেত্রে আব্বুর সবচেয়ে বেশী পছন্দ হলো মসজিদের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান। ঢাকায় এলে আব্বু ফোনে মরুর উষ্ণ দিগন্তের ওপার থেকে বলে দিয়েছিলেন মসজিদের কাছাকাছি বাসা নিতে। যেনো নামাজগুলো জামায়াতে পড়া যায়। তো একদিন…সাকিব মসজিদে হিসু করে দিয়েছিলো। ঐদিন কোনো কারনে আমিও ওদিকেই দাড়িয়েছিলাম। আব্বুকে দেখেছি পকেট থেকে রুমাল বের করে বাঁধ দিয়ে রেখেছেন। যেনো অন্য মুসল্লিদের সামনে না যেতে পারে। নামাজ শেষ হলে বাসা থেকে জগ এনে পানি ঢেলে মসজিদের টাইলস গুলো নিজ হাতে ধুয়ে দিচ্ছেন। সাকিবকে কোনো ধমকা ধমকি না। কিছু একটা বুঝালেন। এতোটুকুন বাচ্চা। কি বুঝলো কি জানি!! তবে আর সে মসজিদে টেপ ছেড়ে দেয়নি। আমরা কত সৌভাগ্যবান। আমাদের আব্বু ঐ ছেলেটির আব্বার মতো হারিয়ে যায়নি। বরং আমাদের প্রতিটি ভুল পদক্ষেপে সতর্ক করেছেন এবং সঠিক ষ্টেপে সাহস যুগিয়েছেন।

বহুদিন পর অনেকটা সময় ধরে জম্পেশ আড্ডা সেরে ২৭ নম্বরে উঠে ফিরছি। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এসে একজনের বিরতিহিন হাঁচি শুনে আবার মনে পড়ে গেলো। এমন বিরতিহিন হাঁচি দেয়া একজন মানুষের সাথে কতো রঙ্গীন দিন কাটিয়েছিলাম। আবার কবে কাটাবো সেই অপেক্ষায়। ভাগ্যের ঘড়িটা বোধহয় কেবলি প্রলম্বিত হয়। আব্বু তুমি কবে আসবে?

Advertisements

Actions

Information

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s




%d bloggers like this: