খাঁচার ভেতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়?

12 01 2011

আঙ্গুলের ডগা কিন্তু শরীরের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থান। ওখানে ব্যাথা পেলে খুব খারাপ হয়ে যায় অবস্থা। আর তা যদি হয় শীতের মধ্যে? জানটা বের হয়ে যায় যেনো তাই না? কাল নখ কাঁটতে গিয়ে বাঁ পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ডগায় সামান্য চোট পাই। খেয়াল ছিলোনা। অজু করতে গিয়ে দেখি লহু জমাট বেঁধে।

বাসে স্যুটেড বুটেড লোকটার ভারি সু’র নিচে যখন প্রকৃতির শৈতালী হাওয়া জমে থাকা বেঁচারা আঙ্গুলখানা পরলো, তখন টের পেলাম ব্যথা কাহাকে বলে। কিন্তু মুখে খুব হাসি রেখেই বললামঃ ভাইজান একটু কষ্ট করে দেখবেন আপনার পদতলে আমার কিছু রইলো কিনা? মশাই বেজায় লজ্জা পেয়ে গেলেন। বিনয়ের প্রকাশ ঝরে পরছিলো না। সরি বলেননি। আমি আশাও করছিলামনা যে সরি বলবেন। কারন আজকাল আমরা অপরের দুঃখে দুঃখি হতে আর অন্যের সুখে সুখি হতে ভুলে গেছি। তবে এতোক্ষনে শুঁকিয়ে যাওয়া ক্ষতমুখ গলে কিছু লাল তরল গরিয়ে পরলো। যা আমি জানি। লোকটি তা জানার প্রয়োজন বোধ করেনি। আমিও তার উপর নাখোশ নই। কারন সে জানেনা সদাচরণ কি জিনিস। জানলে এতোক্ষনেই টের পেতাম। খুব আত্মকেন্দ্রীক হয়ে পড়েছি দিনে দিনে আমরা সবাই। তাই না?

অথচ আত্মকেন্দ্রীকতাকে দূর করতে না পারলে যে আত্মার মুক্তি মিলবেনা কোনোদিন। ঠিক এই কথাটি আজ অনেকবার অনেকভাবে শুনেছি। মনের মানুষ। ষ্টার সিনেপ্লেক্সে অনেকেই এসেছে। গৌতম ঘোষের অসাধারন নির্মান পরিপুর্ণ নাহলেও অনেকটাই আঁকতে সক্ষম হয়েছে লালনের জীবনটা।

পৃথিবীতে কোনো মনিষীরই কারন ছাড়া জন্ম হয়নি। বরং দেখা যায় যে প্রত্যকের পারিপার্শিকতাই তাকে ঠেলে মনিষীদের কাতারে ফেলে দিয়েছে। যখন মানুষের মধ্যে চরম বিসৃংখলা দেখা দিলো যে যার ইচ্ছেমতো চলতে লাগলো তখন আগমন হলো রাষ্ট্রসম্পর্কিত ভাবনার উদ্ভাবকদের- এরিষ্ট্যটল, সক্রেটিস, প্লেটো। যখন বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচালে নড়বড় মানব প্রজাতি আরবের প্রান্তরে এসেছেন কুরয়াআনে বর্ণীত নবী ও রাসুলগন। আরবের বাইরে এইসব অঞ্চলে কনফুসিয়াস, গৌতম বুদ্ধ, তাও তে জিং, মাও, গুরু নানক সহ আরো যত জনেরই অগমন তা কেবলই অভাব পুরনে। এ জাতির প্রয়োজন ছিলো ভাষাণী বঙ্গবন্ধু আর জিয়ার মতো মানুষদের। তাই জাতি তাদেরকে খুঁজে বেড় করে ঠেলে সবার চোখের সামনে পাঠিয়ে দিয়েছে। আজকের পৃথিবীতে ঠিক এমন একটি খরাই চলছে।

সকল মানুষকে মানুষ হিসেবে একটি অবস্থানে এনে দাঁড় করাতে যেনো সবাই ই নারাজ। সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে উচ্চে থাকতে চায়। এতে যে চিপায় পরে মানবিকতা আর মানুষের বেহাল হলো সেই অভাব বোধেই লালনের মতো একজন সাধকের আগমন। এমন একটি সময়ে সে বর্তমান ছিলো যখন এই অঞ্চলের মানুষদের ধর্মবোধের মধ্যে নানান আউল ফাউল কর্মকান্ড বাসা বেঁধে বসেছে। ১৮০০ শতকের প্রথম দিনগুলোতে যুবক লালন পক্সে (যাকে জলবসন্ত বলা হয়) আক্রান্ত হলে তাঁর ধর্মমতে পুড়িয়ে ফেলার হুকুম হয়। কিন্তু সে তখনো জীবিত। তাই দয়া করে ভাসিয়ে দেয়া হয়। অবশেষে মুসলমানদের ঘরে তার সেবা শুশ্রুসা হয়। যার ফলে সে নিজের ধর্মের মানুষের কাছে হয়ে যায় জাত যাওয়া একজন মানুষ।

যখন একজন মানুষ কেবলমাত্র প্রচলিত কোনো ধর্মের কারনে অন্য একটি ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করে যেখানে ঐমানুষটির সাথে বাস্তবিক কোনো পার্থক্য দৃশ্যমান নয় তা একজন ভাবুকের মনে ভাবনার আলোড়ণ সৃষ্টি করতেই পারে। বিদা’আত ও অতীত ধর্মের মিশ্রণে ইসলাম তখন চরম দূষিত একটি ধর্ম। সত্যিকারের ইসলামে অন্য ধর্মের কাউকে ঘৃণা করার তো কোনো অপশন নেই ই বরং বন্ধু হতে উৎসাহিত করা হয়েছে। নয়তো তারা এর উদারতা ও মহত্ব সম্পর্কে জানবে কিভাবে? আর কিছু আলেম ওলি শব্দের অর্থ বন্ধু মনে করে এখনো হয়তো বকে যায় “তোমরা কাফের ও মূশরিকদেরকে তোমাদের বন্ধু রুপে গ্রহণ করোনা” বাক্যটি। অথচ এখানে ওয়ালী শব্দটির অর্থ হচ্ছে অবিভাবক।

সেই সময়ে নিপিড়িত মানুষদের চাহিদাই ছিলো এমন একজন মানুষ। যে ধর্মের উর্ধে উঠে কেবল মাত্র মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করবে। এবং জন্ম হলো একজন সাধকের। হয়তো তার অনেক তত্ত্বেই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। লালন কেমন মানুষ তা বিশ্লেষন করতে আমি বসিনি। সে কতটুকু হারাম করেছে হালাল করেছে তাও আমার আলোচ্য বিষয় নয়। বরং জাত-ভেদ আর হালাল-হারামের বিভেদ খুঁজে যাওয়া মানুষগুলোর নিচু আর অসহিষ্ণু একটি সময়ে মানুষ তাকে আপন করে পেয়েছিলো। এই তো মানুষ হিসেবে আমার সান্তনা। কারন আমি সবার আগে একজন মানুষ (সত্যকারের ইসলাম তাই শিখিয়েছিলো, কিন্তু আমরা মানবিকতার বিষয়গুলোকে দিনে দিনে ভয়ংকর ভাবে উপেক্ষা করছিলাম এবং আজো করছি)। তাই তার চরণ মানুষের মুখে মুখে। আজো ভাবায় সবাইকে একজন মূর্খ মানুষ কি করে এতো সব গভীর কথা বললেন?

যারা ভাবুক তারা এমনিতেই সত্যের সন্ধান পান। প্রকৃতির এটাই নিয়ম। অবাক হই। এনশেইন্ট আমলে মোবাইল নেই, নেট নেই, ছিলোনা বানীকে লিপিবদ্ধ করার কোনো সুযোগ, অথচ ইষ্টার্ণ ফিলোসোফাররা যা ভাবছিলেন ঠিক একই সময়ে ওয়েষ্টের ভাবুকরাও একই রকম বিষয়ে নিজেদের অধ্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আজকের দিনে এগুলোর সংকলন আছে বলেই আমরা ২টাকেই একসাথে জানতে পারছি। কিন্তু তারা??এর মানে কি?? আজব!! বড় আজব এক কারখানায়।

নিশ্চই এতোক্ষণে গুন গুন করে গাইতে শুরু করেছেন—

খাঁচার ভেতর অচিন পাখি
ক্যামনে আসে যায়?

তারে ধরতে পারলে মনো বেড়ী
দিতাম পাখির পায়—-

Advertisements

Actions

Information

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s




%d bloggers like this: