যা থেমে গেলেই শেষ ২১ সম্পর্ক

12 01 2011

[img|http://sonarbangladesh.com/blog/uploads/lalbritto201012261293342504_helping-hand.jpg]

খুউউউউউবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম ওয়ালেট নেই। কোথায় গেলো? হাঁ। রুমে রেখে এসেছি। এই মুহুর্তে স্থুলাকায় দেহ নিয়ে আবার সিড়ি ভাঙ্গতে মন চাইলোনা। খালি পকেটে হাঁটছি- পিঠে ব্যাগ। অনেক স্বাধীন। মোবাইল আর ওয়ালেট না থাকলে স্বাধীনতা কি জিনিশ বেশ ভালো ভাবে উপলব্ধি করা যায়। আরেকদিন বলেছিলাম ওয়ালেটে টাকা না থাকার কথা। আর আজতো পুরো ওয়ালেটটাই নেই। আহ!! স্বাধীনতা!! যারা পরীক্ষা করতে চান করে দেখতে পারেন। গ্যারান্টি দিচ্ছি। বিফলে মুল্য ফেরত। হিহি। ভাবছেন? ভাবেন। আমরা কম বেশী সবাই লেকচারার। অন্যকে খুব লেকচার দিতে পারি। নিজে কখনো মানি কখনো মানিনা। এতো মানামানির কিছু নাই।

আজ মনটা বেজায় খারাপ। তাই হয়তো পরিচিত পৃথিবীর রঙ্গটাও হলুদ লাগছে। শীতের এই মধ্যাহ্নে রোড ডিভাইডারের মাঝে একজন নারী একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি হাতে কি রকম অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গী করছে। হাসছে? না অনেকটা হাসির মতো। কিন্তু ঠিক হাসি না। আবার কান্নাও না। মনে হলো মোনালিসার মতো। রহস্যময়ী। পুরোনো তিনচারটি জামা একটার উপর আরেকটা গায়ে দেয়া। পাশের গাছের গোড়ায় সিমেন্টের বস্তাকে বাজার ব্যাগ বানিয়ে আমরা যে ব্যাবহার করি ওগুলোর মতো একটায় অনেক কাপর চোপর ঠাশা ঠাশা করে ভরে রাখা। একটা চটের দড়ি দিয়ে হাতলটাকে আঁড়াআড়ী করে বাঁধা। মনে হলো বেচারীর অনেক দুঃখ। তাকে পাগলী বলবোনা। আমাদের চোখে সে পাগলী। কিন্তু তার চোখে আমরা সবাই পাগল। কে আসলে পাগল? সমাজ সংসারে সব কাজ করে যাচ্ছি বলেই আমি একজন সুস্থ মানুষ এটা ভাবার কি খুব বেশি মজবুত কোনো কারন আছে? আমি সুস্থ নই। আমিও একজন পাগল। কারন অন্য অনেক সুস্থ মানুষের মতো ভাবতে পারিনা। সবাই কত সহজ ভাবে কতকিছুকে না বলে দিচ্ছে। আমি পারিনা। আমি এর ভেতরে আরো অনেক কিছু খুঁজে পাই। আমার দোষ? আমি সত্যিই বোধহয় পাগল।

ঘুরে ঘুরে মানুষ দেখছি। কত রঙ আর কত বৈচিত্র। আমি কাউকে কিছু বলছিনা। কেউ আমাকে কিছু বলছেনা। নিশ্চুপ। কিন্তু চারিদিকের দৈনিক শব্দগুলো বোধহয় মেটাল সঙ্গীত হয়ে কানের পর্দায় বিকট আওয়াজ তুলছিলো। মার্কেটের ভেতরে ভাঙ্গা হচ্ছে। বাহির থেকে কিছুই বুঝা যাচ্ছেনা। তখনই বুঝছি, যখন রোদে পোড়া হলদেটে শার্টপরা কুলি তার মাথায় করে জীবিকা অন্বেষনের ভারি ইটগুলো মাথায় করে এনে বাহিরে ফেলছিলেন। হাটতে হাটতেই ভাবলাম- আরে? আমি তো ঠিক এই মার্কেটের মতোই। ভেতরে ভাংচুর হচ্ছে। কেউ দেখছেনা। ঐ কুলির মতো যখন শীতের ঘর্মাক্ত রৌদ্দুরের তাপে সবার সামনে ঢেলে দিচ্ছি তখন হয়তো কিছুটা-তা’ও কিছুটা অনুমান করা গেলো। আমি আঘাত প্রাপ্ত। ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কি দিয়ে চেঁপে ধরবো? গলগল করে সম্পর্কের লাল রক্তগুলো ছড়িয়ে পরছে জগতময়।

সম্পর্ক ঠিক হয়তো নদীর স্রোতের মতো। ঝড় আসার ঠিক আগে পর্যন্ত সে একই রকম। যখন ঝড় এলো- চারিদিক থেকে। আকাশ, বাতাস, চন্দ্র, মেঘ ইত্যকার যাবতীয়রা সবাই ঝড়ের পক্ষে। প্রচণ্ড আক্রশে উপুকুলের নাগরীকদের ভাসিয়ে দিয়ে যায়। হয়তো নাগরীক পাওনা ছিলো এ ঝড়। তার পাপ, তার দ্বায়ভার কিংবা তার কর্ম ঝড়কে টেনে এনেছে। এরপর? নাগরীক গৃহহারা। অথচ একদিন এই আকাশের সাথে তার কত স্বপ্নের কথা ছিলো। কত রাত্রীতে চাঁদকে কাছে টেনে বলেছিলো জানিশ? আমাদের একটা পৃথিবী হবে। যেখানে সবাই ঠিক তোকে যেভাবে সেভাবে ভালোবাসে আমারা নিজেদেরকে কাছে টেনে নেবো। যতোই মতপার্থক্য থাকুক সবাই মিলে শান্তিতে কিভাবে বসবাস করা যায় সেই ভাবনাই করবো। হয়তো মধ্যরাত্রীর মতো নিরব স্থবীর হয়ে নিশ্চল। কিংবা বালিশের সাথে একাকী কথপোকথন।
এই হচ্ছে সম্পর্ক। যা এতোদিন পর মনে হলো খুবই বোধহয় সুক্ষ্ণ বীনার তারের মতো। হা ঠিক তাই!! বীনার তার। যা আলতো ছোঁয়ায় খুব ঝংকৃত হয়। সঙ্গীতের তুফান তুলে নিমগ্ন করে নানান আকাস কুসুম কিংবা পরাবাস্তবতার সুউচ্চ চাঁদরের বিস্তৃত অঞ্চলে কয়েক কদমের এই সামান্য হেঁটে চলায়। কিন্তু একটু জোরে চাঁপ লাগলেই যেনো সপাং করে টানা তাঁরটি ছিঁড়ে সম্পুর্ণ। আর সঙ্গীত বাঁজেনা। সময়ের ডানা ছুঁয়ে আগামীর ভেদাভেদহীন একটি পৃথিবীর কোনো পালক সাজায় না। খুবই কি ঠুনকো ছিলো? এতোটা হালকা?

[img|http://sonarbangladesh.com/blog/uploads/lalbritto201012261293342504_HandConstantineCapitoliniMC.jpg]

পৃথিবীটা আমাদের ঘর। একেকজন একেক ভাবে এটাকে সাজাতে চাইবে। এখানের মানুষদের স্বভাবটাই এমন। কেউ হাতুরী দিয়ে ভাংবে। কেউবা বলবে নারে- ভাঙ্গিশনা!! থাকুকনা। কেউবা শুন্যের মাঝে নানান উপাদান দিয়ে অনিন্দ্য ভাষ্কর্য সাজাবে-সচেতন হাতে। এরা সবাই ই যে মানুষ। নানান মতে এরা আপন ঘরটাকে সাজাতে চাইছে। কিন্তু যে সম্পর্কের বাঁধনছিলো এই ঘরের ইস্পাত কঠিন দেয়ালের চেয়েও মোটা তা কিকরে এমন হালকা হয়ে যায়?

মানব চরিত্র অনেক অদ্ভুত। আমি বোধহয় কিছুটা সমান্তরাল। কারো সাথে অতটা মাখামাখিতেও যাইনা। আবার একসময় পুরোনো কলমের মতো কালী শেষ হয়ে গেলে ফেলেও দেইনা। মাঝে মাঝে মনে হয় সম্পর্ক একটা কলম। যাতে অনেক হাসি মাখা কিংবা মান অভিমানের কালী আছে। খুব বেশী ব্যাবহার করলে সে কালী দ্রুতই ফুরিয়ে আসে। একসময় কলমের কোনো খোঁজ থাকেনা। কই? আমি এতো লেখা লিখছি- খোজ রেখেছি আমার পুরোনো অব্যাবহৃত কলমগুলো এখন কোথায় কিভাবে আছে? আমার জেলের ভেতরের ডায়রীতে লিখে যাওয়ার সেই কালো কালীর ইকোনো বলপেনটা এখন কোথায়? পৃথিবীর পরিবর্তনে মানব সভ্যতার নিত্যপ্রয়োজনিয় জিনিশের দাম কেবলি কমে আসছে। তেমনি কমেছে ঘড়ি, মোবাইল,কম্পিউটারের দাম। আমার যে কম্পিউটার আগে ছিলো তার সাথে কত কথা- কত ব্যবহার, হেলাল ভাইয়ের মাধ্যমে অন্যের হাতে চলে যাওয়া সেই উইন্ড পিসিটার আমি তো আর কোনো খোঁজ নেইনি। কলম যেমন অনেকটাই সহজলভ্য তেমনি দিনে দিনে নিত্যপ্রয়োজনিয় সম্পর্কটাও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই একজন দুজন করে বন্ধু জোগার হচ্ছে ফেসবুকে। কি বন্ধুত্ব!! আমাদের!! সেখানেও সম্পর্ক অনেক হালকা একটি বিষয়। মাত্র একটা ক্লিকের বিষয়। ক্লিক- বন্ধুদের তালিকায়, ক্লিক, মুছে ফেললাম। এক্সেপ্টেন্সে কি আনন্দ!! আহা!! আমি বিমোহিত হই!! আবার মুছে দেয়ায় কি আক্রোশ!! আহা!! আমি ক্রমান্বয়ে ভীত হই!! কি সহজ জীবন তাই না?

[img|http://sonarbangladesh.com/blog/uploads/lalbritto201012261293342504_ist2_6071087-computer-screen-and-hand-with-card.jpg]

কি সহজ সম্পর্ক!!
নিজেরা কি টের পাই? পাই না। আমি নিজেও টের পাইনা। কালের পরিক্রমায় আমরা একে অপরের কাছে খুবই অপরিচিত হয়ে উঠছি। খুব কাছা কাছি- অথচ কত সন্দেহ!! খুব পাশাপাশি অথচ কত শ্লেষ, বিদ্রুপ!! ঠাট্টা!! আহা!! এতটুকুও ভাবনা নেই যে তার বক্ষটাকে কিভাবে তীক্ষ্ণ শেলে বিদীর্ণ করে দিচ্ছি আমি। আর বিদীর্ণ বক্ষের এই পথিক পদব্রজে ফিরে আসতে থাকেন তার আঁখড়ার পানে। পথে হুটকরে একটি গাড়ী ভয়াবহ গতীতে এসে ধাম করে রিক্সার পেছনে লাগিয়ে দেয়। সাথে সাথেই বাঁ পাশের চাঁকাটা কাপড় কাঁচতে গেলে যেভাবে থেবড়ানো হয় সেরকম করে নুয়ে পড়লো। রিক্সারোহী পায়ে প্রচন্ড আঘাত পায়। দৌড়ে গিয়ে হাত ধরে তুলে দেই। উঠেই গাড়ীর ড্রাইভিং সিটে বসা ১৮ কি ১৯ বছর বয়সী গোবেচারা হতভম্ব চোখের চেহাড়ায় সেই আঘাত প্রাপ্ত পায়েই দুটো লাথি বসিয়ে দিলো খোলা জানালার পথে। অশ্রব্য উত্তম কিছু কথা শুনিয়ে দিলেন। গাড়ি সাইড করতে চিৎকার চেঁচামেচি। সাইড করার জন্য একটু গতী থামিয়েই উচ্চ গতীতে ছুটে পালালো প্রাইভেটকার।

চারিদিকে মানুষগুলোকে অদম্য আক্রোশে ফেঁটে পরতে দেখছি। আমার অতদিকে নজর নেই। কেবল তাকিয়ে আছি সেই মানুষটার দিকে- যার গত এক সপ্তাহের ঘাম ঝড়ানো টাকাগুলোথেকে জমিয়ে রাখা কিংবা ধার করা টাকায় এই রিক্সাটাকে সারিয়ে তুলতে হবে। হয়তো আরো কিছুদিনের রোজগার বন্ধ। জানিনা আরো ক’দিন তার বস্তিতে রেখে আসা শিশু সন্তান আর বৌকে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। এক বেলায় না খেলেই আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে। রোড ডিভাইডারের পাগলী আমার দিকে তাকিয়ে আছে তার ধুসর চোখের লাল হয়ে উঠা স্ক্লেরার আবরনে, এই এক্সিডেন্ট এইসব কোলাহলে সে একটুও উৎকন্ঠিত নয়। কোনো কেয়ার নেই। যেনো কিছুই ঘটেনি- অথবা ঘটলেও এসব সামান্য বিষয়ে নাক গলানোর কিছু নেই, তার সবটাই মনযোগ আমাকে কেন্দ্র করে। আমি কি? এটাই বোধহয় তার মাথায় খেলে যাচ্ছে। আমি কি অন্যদের মতো পাগল? নাকি তার মত সুস্থ? সব কিছুই ক্যমন যেনো ইন্টারিলেটেড। একটির সাথে অন্যটির অদৃশ্য সম্পর্ক।

দৃষ্টি তার চোখে- সে চোখ নামিয়ে নেয়। ফিরে আসি আস্তানায়। সম্পর্কের সব নিয়ম মেনেই চলতে চাই হয়তো। তবুও কি একটার ঘাটতি হয় কদিন পরেই- কিংবা কখনো চিরদিনের মতো… একটা অব্যক্ত বেদনা কেবলি কূঁকড়ে ফেলছে মন, আমার ভেতরের আমিটাকে-

Advertisements

Actions

Information

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s




%d bloggers like this: