আমাদের পাপে শাস্তিপ্রাপ্তা হেনা

4 06 2011

একটি সমাজকে তার সামগ্রিক বিষয় দিয়েই মূল্যায়ন করতে হয়। তেমনি বঙ্গীয় মুসলিম সমাজকে এদের কাজের বিবেচনায় ইসলামিক বলা যাবেনা। এরা জাতিগত ভাবে মুসলিম কিন্তু ইসলাম এদের মাঝে প্রবেশ করেছে খুবই ভ্রান্ত ভাবে এবং বিরাজ করছে ভয়াবহ একটা বিদঘুটে সামাজিকতার রূপে। এরা যা কিছু করছে তা সত্যিকার অর্থে ইসলামী আচার আচরনের মধ্যে পরে কিনা স্কলাররা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু সাহসী স্কলারের অভাব সর্বত্রই। কালের অব্যাহত আক্রমণে সবাই ইসলামকে কেবলি একটি ধর্ম মনে করছে। অথচ এটা কোনো ধর্ম নয়।

কেনো একটা মানুষকে শাস্তি দেয়ার বেলায়ই কেবল ইসলামকে ডাকতে হবে? তার মানে হচ্ছে ইসলাম মানে জন্মের সময় কানে আযান দেয়া, বিয়ের সময় কালেমা পড়ানো আর মিষ্টি খাওয়া, মৃত্যুর সময় জানাজা পড়িয়ে একটা জীবনের পুরোটাই ইসলামিক করে দেয়ার প্রচেষ্টা। অনেকটা যেনো মুরগীর মাথা খেলাম+ পা খেলাম= পুরো মুরগিটাই খেলাম। অথচ জীবনের প্রতিটি কাজকে স্রষ্টার নির্দেশ অনুযায়ী পালন করার ওয়াদা দিয়ে আত্মসমার্পন করার নামই মুসলিম। এবার কি মনে হয়? যদি কেউ এতা মেনে না নেয় যে ইসলামে কেবল ধর্মীয় আচার আচরণ ছাড়া আর কিছু নেই তাহলে সে ইসলামের কিছু অংশ বিশ্বাস করলো আর কিছু অংশকে অস্বীকার করলো। ইসলাম এরকম পঙ্গু বিশ্বাসীকে মুসলিম মনে করেনা। অবশ্য আমরা যে পঙ্গু এটা আমরা জানিনা বলেই আমাদের পঙ্গুত্ব নিয়ে অহংকারে লিপ্ত হই।

হাস্নাহেনা মঙ্গলবার সকালে স্কুল থেকে এসেই ভাত প্লেটে বসে পরে টেলিভিশনটার সামনে। কি দেখাচ্ছে? নাটক কিংবা হিন্দী সিরিয়াল চলছে। যার বিষয়বস্তু প্রেম ছাড়া কিছু নয়। বাপ টাকা জমিয়ে তিন বছরের ওয়ারেন্টি (তিনবছর পর এটা নষ্ট হতে বাধ্য) সহ একটা কম দামি কালার টেলিভিশন কিনলো ৬মাস আগে। কেননা সাদাকালোতে রঙ দেখা যায় না। আর ভাইবোন সবাই চান্দা দিয়ে ডিশের লাইনের টাকা দিচ্ছে। সিরিয়ালগুলোর স্মার্ট পুরুষগুলো দেখে ওরও ইচ্ছে হয় এমন কারো সঙ্গে দিনযাপনের। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক স্রষ্টা প্রদত্ত্ব ভাবেই ইচ্ছাটা বয়স হওয়ার সাথে সাথেই মানুষের মনে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে যে, একজন সঙ্গীর প্রয়োজন। কিন্তু এই ইচ্ছাটার প্রবলতা ওর ভেতর থেকে আসছে তা নয়। বরং ওটাকে খুব সুক্ষ্ণ ভাবে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে।

আজ শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। সারাদিন ঘরের কাজ গুছিয়ে হাতের কাজগুলো তারাতারি শেষ করতে হবে। কারন যাষ্ট তিনটায় বিছান পেতে বসে বই দেখবে। বই মানে কিন্তু বই না। এটা হচ্ছে ছবি, ছবি মানে ছিনেমা। বাংলা সিনেমা। আশে পাশের যেসব ঘরে টিভি নেই- (আসলে না থাকার সম্ভাবনা খুবই কম) সব পুঁচকেপুঁচকি এসে হাজির। উপস্থাপিকা যেই ঘোষণা করলেন “প্রচারিত হচ্ছে পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি “তুমি আমার”, ব্যাস- ঘর জুড়ে হৈহুল্লোর। তুমুল শব্দে কান ঝালাপালা বাজনা বাঁজিয়ে টাইটেল দেখাচ্ছে। কিন্তু ঠিক যখনই নায়ীকার গাড়ীর চাকায় ছলকে ওঠা ময়লা পানি নায়কের গায় এসে লাগলো, সবাই চুপ। প্রচন্ড মনযোগে দেখছে। নায়িকা গাড়িথেকে নেমে আসছে, তার পা, উরু, এভাবে করে চেহারা। হৈহৈ, এর পর সেই গতানুগতিক চৌধুরি সাহেব, আর নীতিবান, আদর্শবান নায়কের মদ্যপান আর অশ্লীল নৃত্য দেখেও মনে প্রশ্ন না জাগা যে, নীতি বা আদর্শটা আসলে কোথায়? ধিরে হাস্নাহেনার মনে এমন একজন নায়কের সাথে অন্তরঙ্গ হবার বাসনা। বাসনার একান্ত বসবাস হয়তো কখনো কামনায় রুপ নেয়।

পরের দিন, স্কুলে বান্ধবীদের গল্পের আসরে নায়কের রূপের বর্ণনা। কেননা শরীরে নতুন কোনো কিছু ভর করেছে, যা এতোদিন অনুপস্থিত ছিলো। আর সেই কোনো কিছুটা ঘুরে ফিরে মনটাকে এগুলোতেই নিবদ্ধ করতে চায়। কেউ নেই আসে পাশে যে বলে দেবে এভাবে নয়- বরং এভাবে ভাবো। কেউ নেই যে, বলবে, এভাবে নয় এভাবে দেখো।

কি বলছো বৃত্ত তুমি এসব?
আমরাও তো সারাজীবন ছবি দেখে এসেছি বান্ধবীদের কিংবা বন্ধুদের আসরে আড্ডা দিয়েছি। কই? আমাদেরতো এমনটা হয়নি।

জ্বি, হয়তো আপনি সত্যকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন এবং আপনার মনের অবস্থা অনুযায়ী পরিবেশ পাননি যা কিনা আপনাকে অন্ধকারে নিতে পারে অথবা এসব মনে না হওয়ার পেছনে কারন রয়েছে, আপনারা যারা এই লেখাটা পরছেন তারা খুবই শিক্ষিত এবং কিছুটা নৈতীক বোধ সম্পন্ন। হয়তো অশিক্ষিত জনগোষ্ঠির সাইকোলজিক্যাল গ্রথ জন্মানোর বিষয়টি শত চেষ্টাতেও কেউ বুঝবেনা, আবার কেউ হয়তো বুঝবে, কিন্তু আমি আপনাদের কথা বলছিনা। আমি বলছি গ্রাম্য সাধারন একজন কিশোরীর কথা। যার মনন জুড়ে সঙ্গীর অভাব বোধ (শারীরিক ও মানুষিক)। আর চিন্তাজুড়ে একজন নাবিকের অভাব, যে কিনা এইসব চিন্তার ঝড়কে সামাল দিয়েও বন্দরে তরী ভেরাতে পারে।

যে সময়ের তার এই অভাববোধের পূর্নতা পাওয়াতো দূরে থাক মাত্র জন্মানোর কথা সেই সময়ে এটা পূর্নতা প্রয়োজনকে ডিঙ্গিয়ে একদম হাভাতের ক্ষুধায় রুপান্তরিত হচ্ছে। আর ঠিক এই রকম কোনো কিছুর অপেক্ষায় থাকা নিকটাত্মিয়ের রোমশ হাতকে উপেক্ষা করার শক্তি তার থাকার কথা? হতো পুরুষটির স্ত্রী আছে, আছে সন্তান কিন্তু তারও যে চিন্তাটা একসময় ঠিক হাস্নাহেনার কৈশরের অদলেই বেড়ে উঠেছিলো। সে কোন প্রশ্নকে সামনে রেখে নিজেকে সংযত করবে? যা তাকে সংযত করবে তা তো তার মগজে কোনোদিনই ঢুকেনি। শারীরীক কাজ শরীরকে ব্যস্ত রাখে কিন্তু মনকে বাঁধ দেয়ার জন্য প্রয়োজন অন্য কিছু। অথচ এই মনই শরীরের উপর ভর করে আদায় করে নেয় অনেক অন্ধকার।

উপরের পুরো সময়োটাতেই আমরা গুরুত্বপূর্ণ একজনের অনুপস্থিতি টের পাচ্ছি। অনুমান করেনতো সে কে হতে পারে? পাচ্ছেননা? হুম্ম? ঠিক ধরেছেন। এই পাপ প্রক্রিয়াতে অনুপস্থিত যে জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি তিনি হচ্ছেন ফতোয়াবাজ কাঠ মোল্লা। তাকে কাঠ বলা হবে এজন্য যে কাঠের কোনো অনুভুতি নেই, যে যেই করাত দিয়ে তাকে যেভাবে আকৃতি দিতে চায় সে সেভাবেই রুপান্তরীত হয়। যেমন সমাজপতিদের ইশারায় মুহুর্তেই তার ফতোয়া রঙ বদল করে, আবার মসজীদ কমিটির লোকজন সুদ ঘুষ খেলে এসব সংক্রান্ত আলোচনা জুমার দিনে এড়িয়ে যাওয়া, পাছে চাকরি চলে যায়। মোল্লা নিঃসন্দেহে কোরআনের হুকুম বলে পরকালে পার পেতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাকে আটকে যেতে হবে। কেননা সে এই পাপ প্রক্রিয়ার পুরো অংক কে দোররা না মেরে কেবল ভাগষেশ কিংবা অবশিষ্টটা অথবা ফলাফলকেই দোররা মেরেছেন। যা কোরআনের হুকুমের স্পষ্ট লংঘন।

অসহায় কিশোরীকে তার কর্মের জন্য সবাই দুষলেও মনে রাখবেন পরকালে সে এই কাঠমোল্লা অথবা আমাদের মতো অতিবুদ্ধিমান সচেতন মানুষদের মস্তক মারিয়ে জান্নাতে চলেও যেতে পারে। কেননা তাকে আমরাই ঠেলে দিয়েছি পাপ করতে। বাধ্য করেছি এমন একটি কাজে যাকে সে কেবল সামাজিক অপরাধ হিসেবেই হয়তো দেখতো, কিন্তু সেই একই অপরাধ সমাজে প্রচুর হচ্ছে বৈধ উপায়ে। কেউ রেহাই পাবেনা। সকল অপরাধের অপরাধিদের শাস্তি তখনই কার্যকর হতে পারে যখন অপরাধ সংঘটিত হবার কোনো কারন কিংবা ইনফ্লুয়েন্স থাকেনা।

যে আধুনিক মানুষদের অত্যাধুনিক সমাজ সংস্কারের বলি হলো হেনা- সেই মানুষরাই তার মৃত্যু নিয়ে মায়া কান্না ও ইসলামকে কলংকিত করার প্রয়াস চালচ্ছে। আর মহাবুদ্ধিমান কল্যানকামীরা স্বপ্নে বিভোর কখন ক্ষমতায় যাবো আর কখন ছড়ি ঘুড়িয়ে এসব বন্ধ করবো। সমাজ রাজনীতির অংশ নয় বরং রাজনীতিই সমাজের অংশ। তাহলে কেনো রাজনীতি দিয়ে সমাজ সংস্কারের মতো উলটো পথে কল্যানকামীরা হাটছে? বরং সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে এমনিতেই রাজনৈতিক সংস্কার সংগঠিত হওয়ার মতো সহজ পথে প্রত্যাবর্তনই হয়তো সুন্দর রাষ্ট্র ও পৃথিবী গড়তে সহায়ক হবে।

Advertisements

Actions

Information

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s




%d bloggers like this: